Ticker

6/recent/ticker-posts

জামগাছ

source: adobe stock


মালি ছুটতে ছুটতে এল চাপরাশিকে বলল , রাতের ঝড়ে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং এর লনের জাম গাছটা উপড়ে পড়েছে । তার নিচে একটা মানুষ চাপা পড়ে আছে । খবরটা জানাতে চাপরাশি ছুটল ক্লার্কের কাছে । ক্লার্ক ছুটল সেক্রেটারির কাছে।

        ততক্ষণে চাপা পড়া মানুষটিকে দেখতে বেশ ভিড় জমে গেছে । ভিড়ের থেকে একজন বলল মরসুমে এই গাছে অনেক জাম ধরে । কেউ বলল , এই গাছের জাম খুব সুস্বাদু । কেউ আবার উদ্বেগ প্রকাশ করল চাপা পড়া মানুষটিকে নিয়ে । হয়তাে এতক্ষণে মারা গেছে । সব শুনে মানুষটি জানাল সে মরেনি। 

        সঙ্গে সঙ্গে মালি তৎপর হয়ে গেল । গাছটি সরিয়ে মানুষটিকে বের করতে হবে । কিছু ক্লার্কও রাজি হল । কয়েকজন ক্লার্ক আর মালি মিলে গাছটা সরাতে তৈরি । এমন সময় ছুটতে ছুটতে সুপারিনটেনডেন্ট এসে বললেন গাছ সরানাে যাবে না । এজন্য আন্ডার সেক্রেটারির অর্ডার লাগবে। 

        সুপারিনটেনডেন্ট আন্ডার সেক্রেটারিকে বললেন । আন্ডার সেক্রেটারি বললেন ডেপুটি সেক্রেটারিকে । এইভাবে ফাইল গিয়ে পৌছল মন্ত্রীর কাছে।

       এদিকে চাপা পড়া মানুষটিকে ঘিরে ভিড় ক্রমে উপচে পড়েছে । কিছু ক্লার্ক অধৈর্য হয়ে গেল । তারা বিনা অনুমতিতে গাছটি সরাতে গেল । ঠিক সেই সময় সেক্রেটারি এসে বললেন গাছ আমরা সরাতে পারি না । আমরা বাণিজ্য দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত । গাছটি কৃষি দপ্তরের । কৃষি দপ্তরের অনুমতি ছাড়া গাছ সরানাে যাবে না। তবে কৃষি দপ্তরে ফাইল পাঠানাে হচ্ছে । উত্তর এলেই গাছ সরানাে হবে । 

      কৃষি দপ্তর থেকে উত্তর এল গাছ বাণিজ্য দপ্তরের লনে পড়েছে । কাজেই গাছ তারাই সরাবে । এই ভাবে চাপান উতাের চলতে চলতে তৃতীয় দিনে পড়ল । তৃতীয় দিনে ফাইল চলে গেল হর্টিকালচার দপ্তরের ডিপার্টমেন্টে । কৃষি দপ্তর কেবল শাকসজি , ক্ষেত খামার দেখে । গাছটি ফুলদার । ফুলদার গাছের দায়িত্ব হর্টিকালচার দপ্তরের। 

       এদিকে চাপা পড়া মানুষটির অবস্থা ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে । রাতে মালি তাকে কিছু খাওয়াল । মালি তার সঙ্গে নানা কথা বলে । তাকে আশ্বাস দেয় তােমার ফাইল চলছে । আগামীকালের মধ্যে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। 

       হর্টিকালচার দপ্তরের ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি নাকি সাহিত্য দরদি । তিনি সাহিত্যিক ভাষায় ব্যঙ্গপূর্ণভাবে চিঠির উত্তর দিলেন । জামগাছটি একটি ফলদার বৃক্ষ । এই বৃক্ষের ফল সবাই তৃপ্তি করে খাই । ফলদার বৃক্ষকে কাটার আইন আমাদের দেশে নেই। 

       তখন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি বললেন মানুষটিকে নিপুণভাবে দু - খণ্ড করে কেটে বের করতে হবে । তাতে গাছও কাটা পড়বে না । মানুষটিও সমান দু - ভাগে বেরিয়ে আসবে । চাপা পড়া মানুষটি মরিয়া হয়ে বলল ‘ আমি যে মারা যাব।  ' বিচক্ষণ ব্যক্তি। তাকে আশ্বস্ত করে বললেন আজকাল প্লাস্টিক সার্জারির অসাধারণ উন্নতি হয়েছে । আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারিতে দু - খণ্ড দেহ বেমালুম জোড়া লাগানাে যায়। 

        সঙ্গে সঙ্গে ফাইল পাঠানাে হল মেডিকেল দপ্তরের ডিপার্টমেন্টে । সেখানে ফাইল তাড়াতাড়ি চলে গেল সেরা প্লাস্টিক সার্জেনের কাছে । সার্জেন চাপা পড়া মানুষটিকে পরীক্ষা করে বললেন সার্জারি সফল হবে । তবে মানুষটি মারা যাব । কাজেই সে কাজ হল না। 

      এদিকে মানুষটির অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকল । রাতে মালি তাকে খিচুড়ি খাওয়াল । মালি আশ্বাস দিল , কাল সেক্রেটারিয়েটে সব সেক্রেটারিদের নিয়ে মিটিং হবে । তখন তােমার একটা ব্যবস্থা হবে । মানুষটির কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে এসেছে । সে আস্তে আস্তে বলল— জানি আমাকে হয়তাে অস্বীকার করবে না । কিন্তু তােমার কাছে যখন খবর আসবে তখন আমি হয়ত পুড়ে ছাই হয়ে যাব। 

     শুনে মালি আবাক হয়ে বলল তুমি কবি ? 

     পরের দিন খবরটা চতুর্দিকে রটে গেল । চাপা পড়া মানুষটি একজন কবি । সন্ধ্যার মধ্যে সেক্রেটারিয়েটের লন কবিতে কবিতে ভরে গেল । কেউ তাকে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শােনাতে লাগল । কেউ তার কবিতা সম্বন্ধে তাকে আলােচনা করতে বলল । খবরটা সেক্রেটারিটেয়েটের সাব কমিটিতে পৌছল সাথে সাথে সাবকমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল। যেহেতু মানুষটি একজন কবি , কবির চাপা পড়া সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব কেবল সংস্কৃতি দপ্তরের । ঘুরতে ঘুরতে ফাইল চলে গেল সাহিত্য অ্যাকাডেমির সেক্রেটারির কাছে।

       অ্যাকাডেমির সেক্রেটারি শুনেই ছুটে এসে পৌছােলেন মানুষটির কাছে । সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারভিউ নিতে শুরু করলেন । তিনি কি কবি ? তার নাম কি ? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন করে জেরবার করলেন । তিনি অবাক হয়ে গেলেন । আরও অবাক হলেন ‘ ওদের ফুলের মত পদ্য সংগ্রহের লেখক অ্যাকাডেমির সদস্য নন । কি করে এত বড়াে কবির নাম চাপা পড়ে আছে? তিনি তাই ভাবছেন । চাপা পড়া মানুষটি অনেক অনুনয় করে বললেন কবিতা নয় সে নিজেই চাপা পড়ে আছে । দয়া করে তাকে মুক্ত  করা হোক। 

      সেক্রেটারি শুনে বললেন ওটি তার কাজ নয় । তার দপ্তরে সব ডিপার্টমেন্টে দোয়াত কলমের ব্যপার । সেখানে কুড়ল কোদালের কোন ব্যাপার নেই । গাছ কাটা  হয় না । তাকে অ্যাকাডেমির সদস্য করা হয়েছে । তিনি বললে তাঁর স্ত্রীর পেনশনের ব্যবস্থাও করতে পারেন। কিন্তু গাছ থেকে মুক্ত করতে পারবেন না । গাছ কাটা বন দপ্তরের কাজ। 

     কাজেই ফাইল গিয়ে পৌছল বন  বিভাগে । পরের দিন বন বিভাগ থেকে লােক এসে হাজির । গাছ কাটবে । দৌড়ে এল বৈদেশিক দপ্তর । বলে গাছ কাটা বন্ধ করো । গাছ কাটলে পিটোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট হবেন । তিনি দশ বছর আগে এই গাছ সেক্রেটারিয়েটের লনে লাগিয়েছিলেন। 

     কেউ কেউ জোর আপত্তি করে বলে এখানে একটা জীবনের প্রশ্ন আছে । কিন্তু তাদের আপত্তি ধােপে টিকল না । তাদের থামিয়ে অন্য একজন বলল , পিটোনিয়া সরকার আমাদের সবরকম সাহায্য করে । আর আমরা তাদের জন্য একটা জীবন বলি দিতে পারব না?

      এদিকে , আজ আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর শেষ করে ফিরছেন । বিকেলের মিটিং - এ তিনি গাছ কাটা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন । সব বিতর্ক নিজের কাঁধে  তুলে তিনি জীবনমুখী সিদ্ধান্ত নিলেন । আর বিকেলেই তৎপর সেক্রেটারি ফাইল নিয়ে হাজির । গদগদ কণ্ঠে চাপা পড়া মানুষটিকে তিনি বললেন ‘ এই যে শুনছ , কালই গাছ  কাটা হবে । প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে গাছ কাটতে নির্দেশ দিয়েছেন । কাল তুমি বেঁচে যাবে । সেক্রেটারি অনেকবার ডাকলেন।

      কিন্তু মানুষটির কোনাে উত্তর নেই । কবির হাত বরফের মত ঠাণ্ডা । চোখের তারা স্থির । কবি আর কোনােদিনই উত্তর দেবেন না । জীবনের সব ফাইল আজ তাঁর শেষ হয়ে গেছে।

Post a Comment

0 Comments