Ticker

6/recent/ticker-posts

ভগবানের পৃথিবী ত্যাগ

      

source: adobe stock

ভগবানের পৃথিবী ত্যাগ ভগবান যখন বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করলেন , তখন ভাবলেন এই পৃথিবীরই এক কোণে তিনি বাস করবেন । নিজের জন্য আলাদা করে জায়গা জমি রাখলেন। তার এক প্রান্তে বাড়ি করে থাকতে লাগলেন । দূর থেকে মানুষের সংসারযাত্রা দেখেন আর চিন্তা করেন কী উপায়ে মানুষের সঙ্গে তার যােগাযােগ থাকবে। নিজে আগে  বাড়িয়ে সব সময় পৃথিবীর লােকজনের সঙ্গে ভাবসাব করাটা তাে ঠিক হবে না । হাজার হােক , ভগবান বলে  কথা ! মানুষ তাে সামান্য জীব , তারই হাতে গড়া । তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর । তাদের  মালিক। আর করলে মানুষেরই বা তার প্রতি তেমন ভক্তিশ্রদ্ধা থাকবে কেন ? সাত - পাঁচ ভেবে টেবে তিনি এক দূত সৃষ্টি করলেন । নাম দিলেন লেগবা । তার কাজ হল । ভগবান ও মানুষের মধ্যে সম্পর্ক রাখা। মানুষের কাজকর্ম সুখদুঃখের খবর সে ভগবানকে জানায় । আবার ভগবানের হুকুম মানুষকে পৌছে দেয় । এইভাবে দিন যায়।

     মাঝে মাঝে ভগবান লেগবাকে এমন সব জিনিস করতে বলেন যা মানুষের মােটেই পছন্দ হয় না । প্রায়ই ভগবানের আদেশ মানতে বড়াে কষ্ট হয় পৃথিবীর বাসিন্দাদের । কিন্তু লেগবা তাে হুকুমের পাত্র । ভালােমন্দ সবরকম কাজই তাকে মুখ বুজে করে যেতে হয় ।কিছুদিন যেতে না যেতে সে দেখে এক অদ্ভুত ব্যাপার । সে যখন মানুষের মনের মতাে কাজ করে , কেউ তার নামও মুখে আনে না । সবাই ভগবানকে ধন্যি ধন্যি করে । আর যেই তার দ্বারা  মন্দ কিছু ঘটে , অমনি সব দোষ তার ঘাড়ে । সকলে বলে , লেগবাটা হচ্ছে যত নষ্টের মূল । তার কপালে প্রশংসা কোনােদিনই জোটে না।

     ভারী তিতিবিরক্ত লেগবা । একদিন সাহস করে ভগবানকে জিজ্ঞাসা করে বসে , প্রভু , আমি তাে খালি আপনার হুকুমই পালন করি । অথচ ভালাে হলে আপনি পান পুজো আর সব খারাপের জন্য আমি পাই মুখঝামটা । এমন কেন প্রভু ?

      ভগবান উত্তর দিলেন , বস এর নাম সনাতন ধর্ম । জগতের নিয়ম এই । বিশ্বব্ৰত্মাণ্ডের যিনি স্রষ্টা , মানুষ তাকে মঙ্গলময় রূপেই কল্পনা করতে চায় । অথচ মানুষের জীবন সুখদুঃখে মেশামেশি । দুঃখের দায়িত্ব কার ? মানুষ নিজে সে দায় নিতে চায় না । সে খোঁজে শুধু সুখ । কাজেই তৃতীয় কারােকে দরকার যার ওপর বর্তাবে সব অমঙ্গলের দায় । তুমিই সেই তৃতীয় পক্ষ । তােমার জীবনের উদ্দেশ্যই হল দোষ ঘাড়ে নেওয়া । সেই জন্যই তুমি মানুষ আর আমার মাঝখানে দূত।

        বলাবাহুল্য বক্তৃতাটা মােটেই লেগবার মনে ধরল । ইস্ , যত দোষ নন্দ ঘােষ ! দাড়াও দেখাচ্ছি মজা । লেগবা রীতিমতাে মাথা ঘামাতে শুরু করে । কী করে ভগবানকে জব্দ করা যায় । অনেক ভেবেচিন্তে সে একটা ফন্দি আঁটল । একবার ভগবানের খেত জুড়ে ফলেছে রাঙা আলু । লেগ গিয়ে ভগবানকে বলে আসল , প্রভু  সাবধানে থাকবেন । চারিদিকে রটে গেছে আপনার খেতের মতাে মােটা মােটা রাঙা আলু আর কোথাও হয়নি । আপনার রাঙা আলুর খবরে সবার জিভ দিয়ে জল গড়াচ্ছে । কেউ কেউ নাকি বদ মতলবও আঁটছে । রাতবিরেতে এসে হঠাৎ আপনার খেতে হামলা করবে । সব রাঙা আলু তুলে নিয়ে গিয়ে নিজেদের পেট ভরাবে। 

     শুনে তাে ভগবানের ভারী দুশ্চিন্তা । খুব ব্যস্তসমস্ত হয়ে নিজেই পৃথিবীর লোকজনদের ডেকে বললেন , দেখো  হে , আমার খেতের  রাঙা আলুতে যদি কেউ হাত দিয়েছে তার আর রক্ষা  থাকবে না । আমি ঈশ্বর , তােমরা মানুষ । সবসময় যেন এটা খেয়াল থাকে । কারাে যদি নজর লেগে থাকে আমার খেতের আনাজে , এই বেলা নিজেকে সামলে নাও । নইলে সকলের কপালে খুব দুর্ভোগ আছে বলে দিলাম।

      সকলে তাে ভয়ে কাঠ । স্বয়ং ভগবান রাগ করেছেন । কী সাংঘাতিক ব্যাপার ! তাদের মধ্যে সাহসী একজন কোনােরকমে কাপতে কাপতে হাত জোড় করে বলে , না , না , সে কি কখনাে হয় প্রভু ! আমরা সামান্য মানুষ । আপনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন , আমাদের দণ্ডমুণ্ডের মালিক । আপনার জিনিসে হাত দেওয়া তাে আমাদের মহাপাপ । না খেতে পেয়ে বরং শুকিয়ে মরব , তবু আপনার খেতের ফসলের দিকে চাইব না । কখনােই না।

      ভগবানের রাগ তাে খানিকটা কমল । বললেন ,যা যে যার বাড়ি ফিরে যা। 

       সবাই তাে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। 

      নিশুতি রাত । চারিদিক নিস্তব্ধ , নিঝুম । চুপিচুপি খিড়কি দরজা দিয়ে একটা বস্তা বগলে লেগবা ঢােকে ভগবানের বাড়ি । দাওয়াতে ভগবানের চটিজোড়া রাখা থাকে । পা টিপেটিপে চটিজোড়া তুলে নিয়ে লেগবা বাইরে বেরিয়ে আসে সদর দরজা দিয়ে । তারপর চটিজোড়া পায়ে গলিয়ে ধীরেসুস্থে চলে রাঙা আলুর খেতের দিকে । অন্ধকারে কিছু অসুবিধা হয় না । ভগবানের জমিজায়গা ঘরদুয়ার সবেই তার অবাধগতি।

       কিছুক্ষণ আগেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। নরম ভেজা মাটিতে লেগবার পায়ের ছাপ বেশ গভীরভাবে একটার পর একটা বসে যেতে থাকে । রাঙা আলুর খেতে পৌছে একটার পর একটা রাঙা আলু তুলে একটা বস্তায় ঝটাপট সেগুলাে ভরতে থাকে সঙ্গে সঙ্গে  তােলে আর ভরে , তােলে আর ভরে । খেতের পুরাে রাঙা আলু এইভাবে বস্তা বােঝাই করে সে নিয়ে চলে বনের ভেতর । বেশ খানিকটা গিয়ে একটা নিরিবিলি জায়গা দেখে মাটি খুঁড়ে বস্তাটা পুঁতে ফেলে । জায়গাটা একটা ঢিবির মতাে হয়ে থাকে । লেগবা তাতেই খুশি । এখন জোরে জোরে পা ফেলে সদর দরজা দিয়ে ভগবানের বাড়ি ঢুকে চটিজোড়া ঠিক যেমনটি ছিল তেমনটি দাওয়ায় সাজিয়ে রেখে খুব আলতাে পায়ে খিড়কি দিয়ে ফিরে যায় নিজের আস্তানায় ।

         ভাের হতে না হতেই লেগবা ছুটল ভগবানের বাড়ি । তখনও ঘুম ভাঙেনি ভগবানের । সদর দরজাটা নিজেই রাতে ভেতর থেকে বন্ধ করে খিড়কি দিয়ে বেরিয়েছিল। এখন দুম দুম করে দরজা ধাক্কিয়ে চিৎকার জুড়ে দেয় , প্রভু সর্বনাশ হয়েছে , উঠুন উঠুন ! খেতের সব রাঙা আলু কে রাতে এসে তুলে নিয়ে গেছে। হায় হায় কোন হতভাগার এমন আম্পদ্দা হল ! ভগবানের জিনিসে লােভ ! কী পাপ , কী পাপ । হায় হায় ! তার যে ইহকাল পরকাল সব গেল।

          লেগবার কথা শেষ হওয়ার আগেই ভগবান লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে এক দৌড়ে খেতের কাছে চলে গেছেন । দেখেন কী , সত্যিই তাে কোথায় গেল তার এত সাধের রাঙা আলু। আহা অমন সুন্দর কঁপানাে সবুজ পাতা , মাটির ভেতরে তার অমন পুরুষ্টু সব রাঙা আলু , সব ওপড়ানাে ছড়ানাে ছিটানাে পড়ে আছে । এতটুকু আলুও কোথাও নেই !

          রাগে দুঃখে ভগবান তাে মাথার চুল ছিড়তে বসেন আর কি ! তারপরই চোখে পড়ল খেতময় ইয়া ইয়া পায়ের ছাপ । হাক মারলেন , ওরে লেগবা , দেখ এসে । খেত ভরতি কার । পায়ের ছাপ । নিশ্চয়ই সেই চোর ব্যাটার । ডাক , সব মানুষজনকে ডাক । যার পায়ের সঙ্গে এই ছাপ মিলবে তারই নির্ঘাত এই কীর্তি । বড়াে বাড় বেড়েছে এরা । দেখাচ্ছি মজা । রাগে খেত থেকে ফিরে ভগবান দাওয়ায় বসে পড়লেন । নাওয়াখাওয়া মাথায় উঠল । আগে চুরির একটা বিহিত করতে হবে । তারপর অন্য কাজ।

             লেগবার ডাকে মানুষরা সব হাজির । ভয়ে তারা জড়সড় । যদি কারাে পায়ের সঙ্গে এই ছাপ মিলে যায় তাহলে নাজানি কী ভয়ংকর শাস্তি লেখা তাদের সকলের কপালে । ভগবানের রাগ বলে কথা । কঁপতে কাপতে একজনের পর আর একজন পা রাখে ছাপের ওপর । নাঃ , কারাের সঙ্গে ছাপটা পুরােপুরি মেলে না । একে একে মানুষরা সব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

              কিন্তু চোর তাহলে কে ? ভয় কমে গিয়ে সকলেরই খুব কৌতুহল হয়েছে । পায়ের ছাপগুলাে খুব মন দিয়ে দেখে । হঠাৎ একজন বলে বসল , কী বড়াে বড়াে পায়ের ছাপ ! কোনাে মানুষের পা কি এত বড়াে হতে পারে ? অমনি আর পাঁচজন মাথা নেড়ে গম্ভীর মুখে সবজান্তার মতাে বলে , ঠিক কথা , হক কথা । এ তাে মানুষের পায়ের ছাপ নয় । অন্য কারাে । তবে কি লেগবার ? তারা লেগবাকে ধরে  নির্বিকার মুখে লেগবা ছাপের ওপর পা রাখে । সবাই দেখে , মিলল না । নাঃ লেগবাও নয় । তাহলে পায়ের ছাপ কার ? 

        ভগবান তাে এসব দেখেশুনে হতভম্ভ । জিজ্ঞাসা করলেন , মানুষের পায়ের ছাপ নয় । লেগবার পায়ের ছাপ নয় , তাে কার পায়ের ছাপ ? এ পৃথিবীতে দু - পায়ে মাটিতে হাঁটতে পারে এমন আর কে আছে ?

         সবাই এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে । মুখ ফুটে স্পষ্ট কেউ কিছু বলে না । নিজেদের মধ্যে চলে গুজগুজ ফুসফুস । তখন মাথা চুলকোতে চুলকোতে খুব বিনয় সহকারে লেগবা বলল , প্রভু যদি অধীনের অপরাধ না নেন , তাে একটা কথা বলব ?

          ভগবান চুরি রহস্যের কিনারা চান । হুকুম দিলেন , বল কী বলবি । 

          লেগবা খুব মিষ্টি গলায় বলে , প্রভু দেখছেন তাে , কাউকে পরীক্ষা করা বাকি নেই । ছাপের সঙ্গে কারাে পা - ই মিলছে না । কিন্তু চুরি তাে হয়েছে । রাঙা আলুগুলাে নেই । কেউ তাে নিশ্চয় নিয়েছে । তাই বলছিলাম কি , মানে যদি কিছু মনে না করেন , আপনি নিজে একবারটি ছাপের ওপর দাড়াবেন ? 

         লেগবার কথা শুনে ভগবান তাে রেগে গেলেন । কি ! যত বড়াে মুখ নয় তত বড়াে কথা । আমি নিজে রাঙা আলু তুলে লােকের নামে দোষ দিচ্ছি ! তােরা আমাকে ভাবিস কী । আমি না ভগবান !

           লেগবা ঠিক তেমনি শান্ত গলায় বলে , রাগ করবেন না প্রভু , আমরা সামান্য জীব । আপনার দয়াতে আমাদের জন্ম । তবে বলছিলাম কি , এমন তাে হতে পারে রাতে ঘুমের ঘােরে উঠে এসে আপনি নিজে হাতে রাঙা আলুগুলাে তুলে কোথাও সাবধানে রেখে দিয়েছেন তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন — তাই মনে নেই ।

            ভগবান আরও চটে গেলেন , বলি আমি কি মানুষ যে , নিজের অজান্তে কাজ করব ? ওসব করে মানুষরা । তারা জেগে থাকা অবস্থায় যা করতে পারে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তার স্বপ্ন দেখে । কখনাে কখনাে ঘুমন্ত অবস্থায় তা করেও ফেলে । ওটা একটা রােগ । আমি স্বয়ং ভগবান , সর্বশক্তিমান , আমি যখন যা ইচ্ছে করতে পারি । আমার রােগটোগ হয় না । দেখ লেগবা , বাজে প্রশ্ন  করিস না । তােরা আমাকে সন্দেহ করছিস তাে ? ঠিক আছে। 

            গজগজ করতে করতে ভগবান দাওয়া থেকে নেমে এলেন , তবে এই দেখ , কেমন আমার পায়ের সঙ্গে চোরের ছাপ মেলে।

             দুমদাম করে যেই না ছাপের ওপর ডান পাটি ফেললেন , অমনি পায়ের সঙ্গে ছাপ মিলে গেল । গজরাতে গজরাতে বা পাটিও ফেললেন অন্য ছাপের ওপর । সে পা - টিও ছাপের সঙ্গে হুবহু মিলে গেল । ভগবান হতবাক হয়ে দাড়িয়ে । দুই পা দুই ছাপে পুরাে মানানসই । মানুষজন চিৎকার করে উঠল , ওরে ভগবান নিজেই চোর, নিজেই চোর। 

             ছাপের পিছু পিছু সবাই জঙ্গলে গিয়ে রাঙা আলুর বস্তা পোঁতা ঢিবিটায় পৌছােয় । দেখতে দেখতে রাঙা আলু সব বেরােল । ভগবান তাে হেনস্থার একশেষ । তারই হাতে তৈরি সামান্য মানুষের কাছে তার মাথা হেঁট । মানুষজনের হইহল্লা হাসিঠাট্টায় খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে রইলেন । তারপর কোনােরকমে রাগ দুঃখ লজ্জা সামলে বললেন , তােদের মতাে নেমকহারাম প্রাণীদের নিয়ে আমার একসঙ্গে থাকাটাই ভুল । আর আমি তােদের নাগালের মধ্যে থাকব না। 

            মাটির পৃথিবী ছেড়ে এরপর ভগবান চলে গেলেন বহু বহুদূর । সেই থেকে মানুষ থাকে মর্তে , আর ভগবান থাকেন ওই ওপরে স্বর্গে । তাদের মধ্যে আর সম্পর্ক নেই।


Post a Comment

0 Comments